ঘরে ফেরা

রোজ রাতে আমার ঠোঁটে যেন দুটো ঠোঁট আলতো করে নিজের ছোঁয়া লাগিয়ে মিশে যায়। প্রতিবার চোখ খুলে খুঁজতে চেষ্টা করেছি, তাকিয়ে খালি দেখেছি সিলিং আর সিলিং-এর বুকে পাখা। তাই এখন আর চোখ খুলি না। ছোঁয়াটা থেকে যায়, ঠোঁট মিলিয়ে যায়, মুখ পড়ে না মনে। জীবনে কত মানুষই তো এলো, গেছে সবই প্রায়। সকালে যে শহরের চেনা-অচেনা ব্যস্ততা দেখে বিষণ্নতা বুকে বাজে, সেটা রাত্রে এসে মনে করায় শূন্যতাকে, একাকিত্বকে।

সন্ধেবেলা ক্লান্তি ঠেলে যখন সেই নিজের বানানো পোড়া লাগা ঝিঙে পোস্ত আর মাইক্রোওয়েভে গরম করা বাসি ভাত প্লেটে ঢালি, মায়ের কথা বড্ড মনে পড়ে। আজকাল বড্ড নিজেকে স্কুলের প্রথম দিনের বাচ্চাদের মতন লাগে। মায়ের কাছে যাওয়ার কথা মনে পড়ে, মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেতে ইচ্ছে করে, বাবার সাথে বাজারে গিয়ে রুই-কাতলা দরদাম করতে ইচ্ছে করে। নিজের অসফল খাবারের প্লেটের দলাগুলো মুখে নিয়ে একমনে ভেবে যাই এসব। আচ্ছা, মা খেয়েছে তো? আর বাবা? ওষুধপত্র ঠিক করে খায় তো? দুজনেরই তো হাই প্রেসার, বাবার আবার কোমরে স্পন্ডিলাইটিস, মায়ের পায়ে আর্থরাইটিস। বুড়ো-বুড়ি দুটোর জন্য খুব মন কেমন করে।

ছোট ছিলাম তখন, ভেবেছিলাম এই পৃথিবীটা এতোই বড়, সবটা দেখতে হলে পাখি হতে হবে। পাখি হয়েছি। পাখি হয়ে ঘর ছেড়েছি। ছেড়েছি আরো অনেক সুখ, মনের মানুষ, রাগ-বিরাগের আবেগ, মান-অভিমানের লোকজনদের, কঠিন কত সম্পর্ক, মিষ্টি কিছু ভালোবাসা, মন ছুঁয়ে যাওয়া কত বন্ধুত্ব... সবকিছু পাখি হবো বলে। এই এতো বড় পৃথিবীতে প্রচুর পাখি ওড়ে ঠিকই, সবার কি নাম হয়? সবার কি ঠিকানা হয়?

দিনের শেষে সব পাখি বাড়ি ফেরে। ঘরে ফেরার দিন কি সব ফেরত আসে? মানুষ গুলো, মুখ গুলো, আবেগ গুলো, ইচ্ছে গুলো, ভালোলাগা গুলো, ঝগড়া গুলো... সবটা না হোক কিছুটা কি ফিরে পাওয়া যায়? কেউ কি সদর দরজায় দাঁড়িয়ে বলবে “এসো মা, ঘরে এসো”? কে জানে!